বোর্ড পরীক্ষা চলছে।
কোথাও শেষ হয়েছে, কোথাও শুরু হচ্ছে, কোথাও চলছে।
বাড়িতে টিভির ভলিউম কম।
রাতে আলো একটু বেশি জ্বলছে।
মা বলছে — “রিভিশনটা আরেকবার দেখে নে।”
বাবা বলছে — “ঘাবড়াবি না, যেটুকু পারিস লিখে আয়।”
পরীক্ষা হচ্ছে।
কিন্তু আসল পরীক্ষা এখনো শুরু হয়নি।
আসল প্রশ্নটা অন্য।
“এরপর কী?”
মেয়েকে পরীক্ষা দিয়ে আনলেন।
ফিরে এসে চুপচাপ বসে আছেন।
নম্বর মোটামুটি হবে — এই বিশ্বাস আছে।
কিন্তু সায়েন্স দিলে পারবে?
ক্লাস ইলেভেন কি খুব কঠিন?
ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, ম্যাথস — এগুলো কি অন্য লেভেল?
বায়োলজি কি খুব বিশাল?
তিনি জানেন —
নবম-দশম আর ইলেভেন-টুয়েলভ এক না।
আর একটা হিসেব মাথায় আসে—
কোচিং লাগবে?
কত লাগবে?
সময় কত লাগবে?
মেয়ের মানসিক চাপ কেমন হবে?
ছেলে ছোট থেকে কম্পিউটার ভালোবাসে।
কোডিং ভিডিও দেখে।
বন্ধুরা বলছে — “কম্পিউটার নে, ফিউচার ওখানে।”
কিন্তু ইভা দেবী ভাবছেন—
স্কুলের কম্পিউটার সাবজেক্ট আর প্রফেশনাল স্কিল কি এক জিনিস?
বায়োলজি নিলে কি ডাক্তার ছাড়া কিছু নেই?
কম্পিউটার নিলে কি ইঞ্জিনিয়ার হবেই?
ও কি নিজের আগ্রহ আর ট্রেন্ডের মধ্যে পার্থক্য বোঝে?
তিনি ডাক্তার।
অনেকেই ধরে নিয়েছে — ছেলে ডাক্তারই হবে।
কিন্তু স্কুল থেকে আগেই জানাতে বলা হচ্ছে —
ইলেভেনে কোন স্ট্রিম?
ICSE বোর্ডে অনেক সময় বোর্ড পরীক্ষার আগেই স্ট্রিম ঠিক করতে হয়।
অন্য স্কুলে গেলে আগেই ভর্তি নিতে হয়।
পরীক্ষা শেষ হয়নি,
তার আগেই সিদ্ধান্ত?
তিনি ভাবছেন—
ছেলের নিজের ইচ্ছেটা কী?
ও কি সত্যিই এই পথ চায়?
নাকি সামাজিক ধারাবাহিকতা ওকে ঠেলে দিচ্ছে?
নিজে WB বোর্ডে পড়েছেন।
ছেলে এখন ICSE-তে।
এখন প্রশ্ন—
ISC-তেই রাখবেন?
না CBSE-তে দেবেন?
না WB বোর্ডে নিয়ে আসবেন?
বোর্ড বদলালে কি চাপ বাড়বে?
না কমবে?
NCERT alignment কি জরুরি?
লেখার মান কি বোর্ডভেদে আলাদা হবে?
ভবিষ্যতের competitive exam-এর জন্য কোনটা সুবিধাজনক?
এই প্রশ্নগুলো শুধু academic না।
Strategic।
মেয়ের অঙ্ক দুর্বল।
কমার্স দিলে কি সামলাতে পারবে?
আর্টস দিলে কি ভবিষ্যৎ ছোট হয়ে যাবে?
সায়েন্স দিলে যদি পিছিয়ে পড়ে?
তার সঙ্গে আর্থিক চিন্তা—
কোচিং খরচ।
বই।
সময়।
তিনি জানেন —
সিদ্ধান্ত ভুল হলে শুধু সাবজেক্ট বদলানো না,
আত্মবিশ্বাসও বদলে যায়।
শুভঙ্কর ভাবে—
“সবাই সায়েন্স নিচ্ছে।”
“আমি না নিলে কি আমি কম কিছু?”
“আমি পারব তো?”
সুমিত্রা ভাবে—
“বায়োলজি ভালো লাগে না।”
“অঙ্কও ভালো না।”
“আমি কোথায় দাঁড়াই?”
মিষ্টি ভাবে—
“আমি ডাক্তার হব।”
কিন্তু জানে না সেই পথ কত লম্বা।
রাহুল ভাবে—
“আমি কী হতে চাই জানি না।”
“এই বয়সে কি জানা সম্ভব?”
কার্তিক ভাবে—
“কেউ যদি স্পষ্ট করে বলত —
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে কোন পথ যুক্তিসঙ্গত।”
অনেক বোর্ডে, বিশেষ করে ICSE/ISC কাঠামোয়,
বোর্ড পরীক্ষার আগেই স্ট্রিম সিলেক্ট করতে হয়।
অথবা অন্য স্কুলে গেলে আগে থেকেই ভর্তি নিতে হয়।
পরীক্ষা শেষ হয়নি।
রেজাল্ট আসেনি।
কিন্তু সিদ্ধান্ত চাই।
এটাই অনেক অভিভাবককে বেশি অস্থির করে।
“নম্বর না জেনে সিদ্ধান্ত?”
“বোর্ড বদলাবো?”
“School change করলে মানিয়ে নিতে পারবে?”
“CBSE-তে দিলে কি competitive preparation সহজ হবে?”
“ISC-তেই থাকলে কি conceptual depth বেশি?”
“WB বোর্ডে দিলে কি scoring stability থাকবে?”
এইসব প্রশ্ন একসাথে আসে।
• আত্মীয়দের তুলনা
• “ও তো সায়েন্স নিয়েছে” মন্তব্য
• “মেয়েদের জন্য এটা ভালো” টাইপ ধারণা
• রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা
• চাকরির বাজারের চাপ
• সামাজিক অস্থিরতা
এই সবকিছু মিলিয়ে সিদ্ধান্তটা ভারী হয়ে যায়।
অনেক সময় অভিভাবকরা বলেন না, কিন্তু ভাবেন—
“যদি সায়েন্স নিয়ে ও হোঁচট খায়?”
“ক্লাস ইলেভেনে গিয়ে যদি প্রথম টার্মেই খারাপ করে?”
“ওর আত্মবিশ্বাস ভেঙে গেলে?”
নবম-দশমে ভালো রেজাল্ট করা আর
ইলেভেন-টুয়েলভের ধারাবাহিক চাপ সামলানো এক জিনিস নয়।
অনেকে চুপচাপ ভাবে—
“যদি এখন নিরাপদ পথ নিই?”
“কম চাপের কিছু?”
কারণ অনেক বাবা-মা দেখেছেন—
ভুল স্ট্রিমের কারণে অনেক ছাত্র আত্মবিশ্বাস হারিয়েছে।
তারা সন্তানের নম্বর নিয়ে যতটা না ভয় পান,
তার চেয়ে বেশি ভয় পান সন্তানের মন ভেঙে যাওয়া নিয়ে।
এই অংশটা কেউ স্বীকার করে না।
কিন্তু আছে।
“ওর ছেলে তো সায়েন্স নিয়েছে।”
“তোমার মেয়ে কী নিল?”
“কমার্স? ওহ…”
এগুলো সরাসরি অপমান না।
কিন্তু তুলনা তৈরি করে।
অনেক সময় সায়েন্স নেওয়া মানে “ভালো ছাত্র” —
এই ধারণা এখনও সমাজে আছে।
অভিভাবক ভাবেন—
“আমি কি সন্তানের সামর্থ্য অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিচ্ছি?
নাকি সমাজের মানদণ্ড অনুযায়ী?”
কিছু পরিবারে এখনও অদৃশ্য পার্থক্য আছে।
ছেলের ক্ষেত্রে —
“ক্যারিয়ার শক্ত হতে হবে।”
মেয়ের ক্ষেত্রে —
“চাপ যেন বেশি না হয়।”
কেউ উচ্চারণ করেন না।
কিন্তু চিন্তাটা অনেক জায়গায় থেকে যায়।
অনেক WB বোর্ডের ছাত্র ভাবে—
“Competitive exam তো ইংরেজিতে।”
“আমি কি পিছিয়ে যাব?”
অনেক English medium ছাত্র ভাবে—
“আমার কি conceptual depth যথেষ্ট?”
বোর্ড মানে শুধু সিলেবাস না।
আত্মবিশ্বাসের প্রশ্নও।
ICSE থেকে CBSE?
CBSE থেকে ISC?
ISC থেকে WB?
বোর্ড বদলালে—
• সিলেবাস বদলাবে
• মূল্যায়নের ধরন বদলাবে
• বন্ধুবৃত্ত বদলাবে
• স্কুলের পরিবেশ বদলাবে
অভিভাবক ভাবেন—
“ও মানিয়ে নিতে পারবে?”
“নতুন পরিবেশে আত্মবিশ্বাস কমবে না তো?”
আর যেহেতু অনেক বোর্ডে, বিশেষ করে ICSE কাঠামোয়,
বোর্ড পরীক্ষার আগেই স্ট্রিম জানাতে হয়—
তাই সিদ্ধান্তের সময় কম।
এই তাড়াহুড়োই অস্থিরতা বাড়ায়।
শুভঙ্কর ভাবে—
“আমি যদি সায়েন্স না নিই, সবাই ভাববে আমি পারিনি।”
সুমিত্রা ভাবে—
“আমি কি শুধু সহজটা খুঁজছি?”
কার্তিক ভাবে—
“আমি এখনো নিশ্চিত না।
এই বয়সে নিশ্চিত হওয়া কি সম্ভব?”
মিষ্টি ভাবে—
“আমি ডাক্তার হব।”
কিন্তু যখন শুনে — NEET, competition, coaching, pressure —
তখন একটু চুপ হয়ে যায়।
অনেক পরিবারে আর্থিক সীমাবদ্ধতা আছে।
সায়েন্স মানে প্রায়ই অতিরিক্ত খরচ।
কোচিং, বই, সময়।
অভিভাবক ভাবে—
“আমি যদি সামর্থ্যের বাইরে চাপ নিই?”
“ও যদি মাঝপথে বলে এটা ওর জন্য না?”
সিদ্ধান্তটা তখন শুধু academic না,
পারিবারিক অর্থনীতিরও।
এই বয়সে একটা বড় প্রশ্ন থাকে—
“আমি কে?”
আমি কি মেধাবী?
আমি কি মাঝারি?
আমি কি ব্যর্থ হব?
স্ট্রিমের সঙ্গে যেন পরিচয় জুড়ে যায়।
Science নিলে — “ভালো ছাত্র”
Arts নিলে — “creative”
Commerce নিলে — “practical”
কিন্তু সত্যিই কি মানুষ এত সহজে ভাগ হয়?
অনেক সময় ছাত্র যা চায়,
অভিভাবক তা চান না।
আবার অনেক সময় অভিভাবক যা চান,
ছাত্র সেটার জন্য প্রস্তুত নয়।
এটাই স্বাভাবিক।
একজন ছাত্র বলতে পারে—
“আমি কম্পিউটার নেব।”
কিন্তু কেন?
বন্ধুরা নিচ্ছে?
না সত্যিই ও coding ভালোবাসে?
কেউ বলতে পারে—
“আমি ডাক্তার হব।”
কিন্তু সেটা কি স্বপ্নের গভীরতা থেকে?
না কি সমাজের সবচেয়ে পরিচিত পেশা বলে?
কেউ বলে—
“আমি আর্টস নেব, চাপ কম।”
কিন্তু সেটা কি সত্যিকারের আগ্রহ?
না কি কঠিন থেকে পালানোর চেষ্টা?
এই বয়সে চাওয়া থাকে।
কিন্তু সেই চাওয়াটা সবসময় বিশ্লেষণ করা থাকে না।
অভিভাবক ভাবেন—
“সায়েন্স নিলে ভবিষ্যৎ খোলা থাকবে।”
“কমার্সে stability আছে।”
“আর্টস নিলে competition কম।”
অনেকে বলেন না,
কিন্তু মনে করেন—
“আমি যা পাইনি, সন্তান যেন পায়।”
এখানে ভালোবাসা আছে।
স্বপ্ন আছে।
কিন্তু কখনও কখনও সেই স্বপ্ন সন্তানের বাস্তব ক্ষমতার সাথে পুরো মেলে না।
সমস্যা তখন হয়—
যখন ছাত্রের ইচ্ছা অযৌক্তিক হয়
এবং অভিভাবক সেটা প্রশ্ন করেন না।
অথবা
যখন অভিভাবকের চাপ এত বেশি হয়
যে ছাত্র নিজের ইচ্ছা বলতে ভয় পায়।
দুটোই ক্ষতিকর।
শুধু ছাত্রের ইচ্ছা দিয়ে সিদ্ধান্ত নিলে
দীর্ঘমেয়াদে সমস্যা হতে পারে।
শুধু অভিভাবকের চাপ দিয়ে সিদ্ধান্ত নিলে
আত্মবিশ্বাস ভেঙে যেতে পারে।
না একপক্ষের জয়।
না অন্যপক্ষের পরাজয়।
দরকার —
যুক্তিসঙ্গত আলোচনা।
ছাত্রের চাওয়া শুনতে হবে।
অভিভাবকের উদ্বেগও মানতে হবে।
তারপর দেখতে হবে—
এই ইচ্ছেটা কি বাস্তবতার সাথে মিলছে?
এই সিদ্ধান্তটা কি আগামী পাঁচ বছর টিকবে?
এই পথটা কি সামর্থ্য, আগ্রহ, ও পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?
এই বয়সে কেউ সম্পূর্ণ নিশ্চিত নয়।
অভিভাবকরাও না।
ছাত্রও না।
তাই সিদ্ধান্তটা একতরফা হলে ভারসাম্য নষ্ট হয়।
দুজনের কথাই জরুরি।
কিন্তু যুক্তির আলোয়।
এই পর্যন্ত যা আলোচনা হলো —
এগুলো কারও একার সমস্যা নয়।
এগুলো প্রায় সব পরিবারের বাস্তব অবস্থা।
এই জায়গায় দাঁড়িয়ে সবচেয়ে বড় ভুলটা কী হতে পারে জানেন?
তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নেওয়া।
অথবা ভয় থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া।
Before deciding anything, let’s understand the structure.